বাম দিক থেকে ওয়ারেনের ৩৮ বছর বয়সী অ্যালেক্সিস অ্যান্থনি এবং ল্যান্সিংয়ের ৩৬ বছর বয়সী জেনা ক্যাটালো, আজ ২২ মার্চ ডেট্রয়েটে অনুষ্ঠিত ‘মার্শ দু ন্যান রুজ’ প্যারেড শেষে হেঁটে যাওয়ার সময় ছবির জন্য পোজ দেন/Photo : Robin Buckson, The Detroit News
ডেট্রয়েট, ২২ মার্চ : আজ রবিবার শহরের সেকেন্ড স্ট্রিট ধরে কেউ লাল ভূতের খোঁজে, আবার কেউ নিছক আনন্দ আর মজা করার জন্য অংশ নেন এক ব্যতিক্রমী পদযাত্রায়।
ডেট্রয়েটের ঐতিহাসিক ক্যাস করিডোরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সামাজিক-শিল্পকলা প্যারেড ‘মার্শ দ্যু নেইন রুজ’ রবিবার বিকেলে সেকেন্ড ও ক্যানফিল্ড স্ট্রিট থেকে শুরু হয়। এতে প্রাপ্তবয়স্ক, পরিবার এবং এমনকি পোষা প্রাণীরাও লাল মুখ, শিং, টপ হ্যাট, রোলার স্কেটসহ নানা সাজে সজ্জিত হয়ে একসঙ্গে পদযাত্রা করেন।
এই মিছিলটি বসন্তের আগমনী বার্তা বহন করার পাশাপাশি ডেট্রয়েটের অন্যতম প্রাচীন কিংবদন্তি লাল বামন ‘নেইন রুজ’-এর প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। যদিও রবিবার আকাশ ছিল মেঘলা ও শীতল, তবুও অংশগ্রহণকারীদের উচ্ছ্বাসে কোনো ঘাটতি ছিল না।
হান্টিংটন উডসের ৫৭ বছর বয়সী স্কট কলিন্স বলেন, “এটা নিছক আনন্দের জন্য। কোনো কোনো বছর আবহাওয়া আরও সুন্দর থাকে, তবে আসল বিষয় হলো সবাই একসঙ্গে ভালো সময় কাটানো। আমরা প্রতি বছরই এখানে আসি।” পদযাত্রার সময় তার মাথায় ছিল লাল টপ হ্যাট এবং হাতে ছিল গর্জনরত এক লাল হবগবলিনের ছবি, যাকে তিনি ‘রুজ’ বলে উল্লেখ করেন।
প্যারেডে শত শত মানুষ হ্যালোউইনধর্মী পোশাক থেকে শুরু করে পুরোনো দিনের আলমারির পোশাক, এমনকি নিজেরাই লাল দেহের প্রাণীতে রূপ নিয়ে অংশ নেন।
মেবির ২৬ বছর বয়সী অ্যাড্রিয়ানা পিট প্রথমবারের মতো এই প্যারেডে অংশ নিয়ে বলেন, “আমি বেশ কিছুদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অনুষ্ঠান নিয়ে পোস্ট দেখছিলাম। কাল্ট ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো আমার ভালো লাগে, তাই এখানে এসে সত্যিই দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে। ডেট্রয়েট শহর ও বিভিন্ন বিক্রেতাদের ঘুরে দেখতেও খুব ভালো লেগেছে।”
নেইন রুজের ইতিহাস ডেট্রয়েটের প্রতিষ্ঠাকাল পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতি বছর ক্যাস করিডোর এলাকায় এই রসিকতাপূর্ণ ও সৃজনশীল প্যারেডের আয়োজন করা হয়, যেখানে ছোট-বড় সাইকেল, মানুষের শক্তিতে চালিত ফ্লোট এবং নানা শিল্পকর্মের মাধ্যমে নেইন রুজের প্রতীকী উপস্থিতি তুলে ধরা হয়।
এটি মার্ডি গ্রা-র মতো এক ধরনের উৎসব, যেখানে স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী অষ্টাদশ শতাব্দীতে ডেট্রয়েটের প্রতিষ্ঠাতা আঁতোয়ান দে লা মোথ ক্যাডিলাকের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছিল, ঠিক তেমনভাবেই অংশগ্রহণকারীরা প্রতীকীভাবে শয়তানি হবগবলিন ‘নেইন রুজ’-কে তাড়া করে এবং বিদ্রূপ করে।
সেকেন্ড স্ট্রিটজুড়ে দেখা যায় নানা রঙিন ও ব্যতিক্রমী সাজ। সবুজ লেয়োটার্ড পরা গরিলা, ভাঁড়, ঝাড়ু হাতে ডাইনি, মাকড়সা, বুদবুদ ওড়ানো ভূত তাড়ানোর দল—সব মিলিয়ে যেন এক অভিনব রঙিন মিছিল। পথচারীদের হাতে ছিল “নাইন, নাইন দূর হও” এবং “রাজা নেই, নাইন নেই” লেখা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড।
পোশাক পরিহিত আনন্দকারীদের মধ্যে ছিলেন ডেট্রয়েটের অ্যাশটন ক্রেমার এবং তার বন্ধু ওয়েস্টল্যান্ডের সারাহ নুনেজ ও হ্যাজেল পার্কের ম্যাট লিয়ামিনি।
ক্রেমার হাতে তৈরি মুরগির মাথাসহ একটি মুরগির পোশাক পরে অংশ নেন এবং অন্যান্য সৃজনশীল সাজসজ্জা দেখে মুগ্ধ হন। বিশেষ করে ১৫ বছরেরও বেশি সময় পর আবার এসে তিনি প্যারেডে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন।
ক্রেমার বলেন, “এই কঠিন সময়ে অনেক মানুষের সঙ্গে সেজেগুজে একসঙ্গে থাকা সবসময়ই ভালো লাগে। আমি বহু বছর আগে প্রথমবার এখানে এসেছিলাম, আর এখন এটি কতটা বড় হয়ে উঠেছে তা দেখে সত্যিই অবাক লাগছে।”
৫৬ বছর বয়সী নুনেজ বলেন, “এটা দারুণ একটি আয়োজন। খুব বেশি আনুষ্ঠানিক বা সংগঠিত নয়—মানুষ শুধু একত্রিত হয়, হাঁটে এবং আনন্দ করে। এটাই এর আসল মজা।” তিনি লাল পোশাক, বড় হার্ট আকৃতির নেকলেস এবং ধূসর সুতোর উইগ পরে অংশ নেন।
নাইন রুজ কে?
ভিজিটডেট্রয়েটের ওয়েবসাইট অনুসারে, প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী নাইন রুজ একটি ছোট, কালো ও কুৎসিত রক্তবর্ণ বামনসদৃশ মূর্তি, যার রয়েছে ছুঁচালো দাঁত এবং জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো চোখ। ডেট্রয়েট শহরের লোককথায় তাকে দুর্ভাগ্যের অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং বলা হয়, সে শহরের আশপাশে ঘুরে বেড়ায় ও অশুভ ঘটনার পূর্বাভাস দেয়।
এই কিংবদন্তির উৎস কোথায়?
ভিজিটডেট্রয়েটের তথ্যমতে, নাইন রুজের কিংবদন্তি ১৭০০-এর দশকে ডেট্রয়েট শহর প্রতিষ্ঠার সময় থেকে প্রচলিত হয়ে আসছে। বলা হয়, শহরের প্রতিষ্ঠাতা আঁতোয়ান দে লা মোথ ক্যাডিলাক কিউবেকে এক পার্টিতে থাকাকালীন একজন ভাগ্যগণনাকারীর কাছ থেকে ভবিষ্যদ্বাণী শুনেছিলেন। ওই ভাগ্যগণনাকারী তাকে সতর্ক করে বলেন, তার ভবিষ্যৎ অভিযানে নাইন রুজের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে এবং তাকে তোষামোদ করে সন্তুষ্ট রাখতে হবে। এতে তিনি এমন একটি শহর প্রতিষ্ঠার সৌভাগ্য অর্জন করবেন, যা ফ্রান্সের শহরগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। কিন্তু যদি তিনি সেই পিশাচকে অসম্মান করেন, তবে দুর্ভাগ্য তার জীবনকে গ্রাস করবে।
পরবর্তীতে ক্যাডিলাক জাহাজে করে যাত্রা শুরু করেন এবং ডেট্রয়েট নদীর পশ্চিম তীরে ফোর্ট পন্টচার্ট্রেইন ডু ডেট্রয়েট প্রতিষ্ঠা করেন। দুর্গটি দীর্ঘদিন সমৃদ্ধি লাভ করলেও এক রাতে নাইন রুজকে দেখা যায় বলে প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, তাকে সম্মান জানানোর পরিবর্তে ক্যাডিলাক লাঠি দিয়ে আঘাত করে শহর ছেড়ে যেতে বলেন।
এরপরই নাইন রুজ অন্ধকারে মিলিয়ে যায় এবং ক্যাডিলাকের জীবনে দুর্ভাগ্য নেমে আসে। একটি সূত্র অনুযায়ী, তাকে তার মর্যাদাপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে সপরিবারে লুইজিয়ানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে ডেট্রয়েটের বিভিন্ন বড় বিপর্যয় যেমন ১৮০৫ সালের অগ্নিকাণ্ড, ১৯৬০-এর দশকের দাঙ্গা এবং ১৯৭৬ সালের তুষারঝড় প্রতিটির সঙ্গেই লোককথায় নাইন রুজের নাম জড়িয়ে পড়ে।
এই কিংবদন্তিকে কেন্দ্র করেই বসন্তকালীন বিষুবের (Vernal Equinox) পরবর্তী রবিবারে ডেট্রয়েটবাসীরা প্রতি বছর একটি প্রতীকী শোভাযাত্রার আয়োজন করে, যেখানে তারা একত্রিত হয়ে ‘নাইন রুজ’-কে প্রতীকীভাবে তাড়ানোর মধ্য দিয়ে শহরের অশুভ শক্তিকে বিদায় জানায় এবং নতুন বসন্তকে স্বাগত জানায়।
Source & Photo: http://detroitnews.com
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :